International Day for the Conservation of the Mangrove Ecosystem

ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক দিবস প্রাকৃতিক বৈচিত্রতার একটা উল্লেখযোগ্য নমুনা ম্যানগ্রোভ বনভূমি এবং এর ইকোসিস্টেম ৷ প্রতিকূলতায় হার না মেনে কৌশলে টিকে থাকার এক অনন্য উদাহরণ এই বনভূমি ৷ শুধু নিজের টিকে থাকা নয়, সমুদ্র উপকূলে ঢালের মতো ঝড়-ঝঞ্ঝার মোকাবিলা করে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মানব পরিবেশকে রক্ষাতেও এই বনভূমি জুড়ি মেলা ভাড় ৷ অথচ আমরা মানুষদের লোলুপ নজর থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো উপায় হয়তো তাদের জানা নেই বলে পৃথিবীতে ১,৮১,০০০ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের আয়তন ১,৫০,০০০ বর্গ কিমি এর নিচে নেমে এসেছে। এই বনাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এর ইকোসিস্টেম ৷ আর এই ইকোসিস্টেম সংরক্ষণের জন্যই প্রতিবছর ২৬ জুলাই পালিত হয় ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক দিবস (International Day for the Conservation of the Mangrove Ecosystem) ৷ কেন এবং কীভাবে এই দিবস? ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেমের গুরুত্বকে “a unique, special and vulnerable ecosystem” হিসাবে সচেতনতা বাড়াতে এবং তাদের সাস্টেনেবল ম্যানেজমেন্ট, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের জন্য সমাধানগুলির প্রচার করার জন্য এই দিনটি পালিত হয় ৷ ২০১৫ সালে জাতিসংঘের শিক্ষামূলক, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের (ইউনেস্কো) সাধারণ সম্মেলনের মাধ্যমে দিবসটি গৃহীত হয়েছিল। ইকুয়েডরে ম্যানগ্রোভ কেটে চিংড়ি চাষ করার প্রতিবাদে ১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই আয়োজিত এক সমাবেশ ৷এই দিন গ্রিনপিসের এক্টিভিস্ট হ্যাহো ড্যানিয়েল ন্যানোটো প্রতিবাদের সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর স্মরণে দিনটিকে বেসরকারিভাবে আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস পালন করা হয়। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল কী? ম্যানগ্রোভ (Mangrove) বলতে সাধারণভাবে জোয়ারভাটায় প্লাবিত বিস্তির্ণ জলাভূমিকে বোঝায়। ম্যানগ্রোভ বন (Mangrove forest), জোয়ারভাটায় বিধৌত লবনাক্ত সমতলভূমি। অর্থাৎ সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানি বেষ্টিত বনভূমিকে ম্যানগ্রোভ বন বলে। পৃথিবীতে ১০২টি দেশে ম্যানগ্রোভ বনের অস্তিত্ব থাকলেও কেবল ১০টি দেশে ৫০০০ বর্গ কিলোমিটারের বেশি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল রয়েছে। পৃথিবীর সমগ্র ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ৪৩% ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া এবং নাইজারে অবস্থিত । আর বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল হলো সুন্দরবন ৷ বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে এর আয়তন ১০ হাজার ২৩০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ৬ হাজার ৩০ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে। বাকিটা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র খুবই বৈচিত্রময় এবং উৎপাদনশীল ৷ বিশেষ করে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা এবং লোনা পানির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর কৌশলগুলো একই সাথে চ্যালেঞ্জিং ও নান্দনিক ৷ এই বনাঞ্চলে প্রধানত বৃক্ষ, বীরুৎ, গুল্ম এবং সামান্য পরিমানে পাম ও লতা জাতীয় উদ্ভিদ রয়েছে। দি ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন ইউনিয়ন (আই.ইউ.সি.এন) এর হিসাব মতে পৃথিবীতে ম্যানগ্রোভের ৬১টি প্রজাতি রয়েছে। অধিকাংশ ম্যানগ্রোভ প্রজাতি ১৫টিরও কম পরিবারের অন্তর্গত। অধিকাংশ ম্যানগ্রোভ প্রজাতি রাইজোফোরেসি (Rhizophoraceae), সোনারেসিয়েসি (Sonneratiaceae), এভিসিনিয়েসি (Avicenniaceae) পরিবারভূক্ত। ম্যানগ্রোভ বীজ ও বংশ বিস্তারের অঙ্গ সমূহ (Propagules) জোয়ারভাটার মাধ্যমে উজান ও ভাটি অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। শ্বাসমূল ও জরায়ুজ অঙ্কুরোদগম এই বনাঞ্চলের উদ্ভিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ৷ প্রাণীকূলেও রয়েছে বৈচিত্র ৷ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি পরিবেশগত গুরুত্বও অনেক এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ৷ এই বনভূমি বায়ুমন্ডল থেকে প্রচুর পরিমান কার্বন-ডাই-অক্সাইড টেনে নেয় এবং এ কার্বন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের শরীরে জমিয়ে রাখে ৷ জমিয়ে রাখা কার্বনকে ‘ব্লু কার্বন’ বলা হয়। এর এভাবে বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউস গ্যাসের প্রভাব হ্রাস করে ৷ গবেষণায় দেখা যায় এক হেক্টর কেওড়া বন বছরে ১৭০ টান পর্যন্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড আটকে রাখতে সক্ষম। এছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতেও ম্যানগ্রোভ বনভূমি অতুলনীয় ৷ উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় সুন্দরবনের কথা ৷ ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় থেকে শুরু করে সকল প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধসহ সাম্প্রতিককালে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় কিংবা সিডর থেকে সুন্দরবন বুক উঁচিয়ে রক্ষা করেছে বাংলাদেশকে ৷ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের প্রতিরক্ষার দেয়াল সুন্দরবন। প্রতি বছর কমছে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের আয়তন ৷ জনসংখ্যার আধিক্য ও শিল্পায়নে প্রাকৃতিক শোধনাগার হিসেবে পরিচিত এই বনাঞ্চলের ইকোসিস্টেম আজ হুমকির মুখে ৷ বিশ্ব সমাজের পাশাপাশি আমাদের ব্যক্তিগতভাবেও এর রক্ষায় এগিয়ে আসা উচিত ৷ শুধু সভা সেমিনার আর সামাজিক মাধ্যমে আবদ্ধ না থেকে এই দিবসের গুরুত্ব অনুধাবন করে আমাদের নিতে হবে বাস্তবিক উদ্যোগ ৷

Leave a Comment